নতুন পোষ্ট মাষ্টার আসলো। তাকে সমস্থ চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে, পুরনো পোষ্ট মাষ্টার উঠে পড়লো। যাবার সময়ে রতনকে ডেকে বললেন - "রতন তোকে আমি কখনো কিছু দিতে পারিনি। আজ যাবার সময়ে তোকে কিছু দিয়ে গেলাম। এতে তোর দিন কয়েক চলে যাবে"
কিছু পথ-খরচা বাদে তার বেতনের যতটাকা পেয়েছিলেন; পকেট থেকে বের করলেন। তখন রতন ধোলয় পড়ে তার পা জড়িয়ে ধরে বললো- "দাদা বাবু, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে কিছু দিতে হবে না। আমার জন্যে কাউকে কিছু ভাবতে হবে না" বলে এক দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেলো।
পোষ্ট মাষ্টার নিশ্বাস ফেলে, মোটের মাথায় নীল ও সাদা রেখায় ছবি আকা টিনের পেট্রা তুলে দিয়ে, ধীরে ধীরে নৌকার দিকে চললেন। যখন নৌকায় উঠলে- বর্ষা বিস্ফারিত নদী, পৃথিবীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির মত ছলছল করতে লাগলো। তখন একবার নিতান্ত ইচ্ছে হলো - ফিরে যাই, জগতের সেই কোলহারা অনাথিনীকে সঙ্গে করে নিয়ে আসি।
কিন্তু তখন পানে বাতাস পেয়েছে। নদীর স্রোতে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্তের উদয় হলো - জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে; ফিরে ফল কি? পৃথিবীতে কে কার? কিন্তু রতনের মনে কোন তত্তের উদয় হলো না। সে, সেই পোষ্ট অফিস পারের চারদিকে কেবল চোখের জলে ভেসে ঘুরে ঘুরে বেরাচ্ছে।
বোধ করি, তার মনে ক্ষীন আসা জেগেছিলো - দাদা বাবু, যদি ফিরে আসে? সেই বাধনে পড়ে কিছুতেই দূরে যেতে পারছিলো না। হায় বুদ্ধিহীন মানব হৃদয় ভুল কিছুতেই ঘোচে না। প্রবল প্রমাণকে অবিশ্বাস করে, মিথ্যে আশাকে দুহাতে বেধে, বুকের ভিতরে প্রানপনে জড়িয়ে ধরা যায়?
অবশেষে একদিন সমস্থ নারি কেটে, হৃদয়ের রক্ত শুষে, সে পালায়। তখন চেতনা হয় এবং দ্বিতীয় ভ্রান্তিভাসে পড়বার জন্য চিত্ত ব্যাকুল হয়ে ওঠে